কম্পিউটার ভাইরাস হলো এমন এক ধরনের ক্ষতিকর প্রোগ্রাম, যা ব্যবহারকারীর অনুমতি ছাড়াই কম্পিউটারে ঢুকে নিজের কপি তৈরি করে এবং ফাইল, সফটওয়্যার ও সিস্টেমের ক্ষতি করে। আজকের ডিজিটাল যুগে অফিসের কাজ থেকে শুরু করে ব্যাংকিং, পড়াশোনা—সবকিছুই কম্পিউটার ও ইন্টারনেটনির্ভর। তাই কম্পিউটার ভাইরাস সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকা এখন প্রত্যেক ব্যবহারকারীর জন্য জরুরি।
এই লেখায় আমরা জানব কম্পিউটার ভাইরাস কি, এর ইতিহাস, কত প্রকার, আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণ এবং কীভাবে নিজের ডিভাইসকে নিরাপদ রাখবেন।

কম্পিউটার ভাইরাস কি?
VIRUS-এর পূর্ণরূপ হিসেবে প্রচলিত আছে Vital Information Resources Under Seize। অর্থাৎ, গুরুত্বপূর্ণ তথ্যভান্ডার দখলে নেওয়া।
সহজ ভাষায়, কম্পিউটার ভাইরাস হলো একটি ছোট প্রোগ্রাম বা কোড, যা অন্য কোনো ফাইল বা প্রোগ্রামের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করে রাখে। ওই ফাইলটি চালু করলেই ভাইরাস সক্রিয় হয়ে যায়।
মানবদেহের ভাইরাস যেমন এক কোষ থেকে আরেক কোষে ছড়ায়, তেমনি এটিও এক ফাইল থেকে আরেক ফাইলে, এক কম্পিউটার থেকে আরেক কম্পিউটারে ছড়িয়ে পড়ে। এ কারণেই এর নাম “ভাইরাস”।
কম্পিউটার ভাইরাসের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
- ১৯৭১ সাল: “Creeper” নামের একটি পরীক্ষামূলক প্রোগ্রামকে প্রথম স্ব-প্রতিলিপি তৈরিকারী প্রোগ্রাম হিসেবে ধরা হয়।
- ১৯৮২ সাল: “Elk Cloner” অ্যাপল II কম্পিউটারে ছড়ানো প্রথম দিকের ভাইরাস।
- ১৯৮৩ সাল: গবেষক ফ্রেড কোহেন প্রথম “কম্পিউটার ভাইরাস” শব্দটি জনপ্রিয় করেন।
- ১৯৮৬ সাল: পাকিস্তানের দুই ভাই বাসিত ও আমজাদ ফারুক আলভি তৈরি করেন “Brain” ভাইরাস, যাকে আইবিএম পিসির প্রথম ভাইরাস বলা হয়।
- ২০০০ সাল: “ILOVEYOU” ভাইরাস ইমেইলের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ কম্পিউটারে ছড়িয়ে পড়ে।
বিস্তারিত ইতিহাস জানতে পড়ুন- উইকিপিডিয়ার Computer Virus নিবন্ধ।
কম্পিউটার ভাইরাস কীভাবে ছড়ায়?
কম্পিউটার ভাইরাস সাধারণত নিচের মাধ্যমগুলো দিয়ে ছড়ায়:
- পেনড্রাইভ ও মেমোরি কার্ড: আক্রান্ত কম্পিউটারে ব্যবহৃত পেনড্রাইভ অন্য কম্পিউটারে লাগালে।
- ইমেইল অ্যাটাচমেন্ট: অপরিচিত ঠিকানা থেকে আসা ফাইল খুললে।
- পাইরেটেড সফটওয়্যার: ক্র্যাক বা নকল সফটওয়্যার ইনস্টল করলে।
- অনিরাপদ ওয়েবসাইট: সন্দেহজনক সাইট থেকে কিছু ডাউনলোড করলে।
- লোকাল নেটওয়ার্ক: একই নেটওয়ার্কে যুক্ত অন্য কম্পিউটার থেকে।
- ভুয়া লিংক: সোশ্যাল মিডিয়া বা মেসেঞ্জারে আসা লোভনীয় লিংকে ক্লিক করলে।

কম্পিউটার ভাইরাস কত প্রকার?
গঠন ও আক্রমণের ধরন অনুযায়ী কম্পিউটার ভাইরাস অনেক প্রকার হতে পারে। নিচে প্রধান ১০টি প্রকার তুলে ধরা হলো।
১. বুট সেক্টর ভাইরাস (Boot Sector Virus)
হার্ডডিস্ক বা পেনড্রাইভের বুট সেক্টরে আক্রমণ করে। কম্পিউটার চালু হওয়ার সময়ই এটি সক্রিয় হয়ে যায়।
২. ফাইল ইনফেক্টর ভাইরাস (File Infector Virus)
.exe বা .com এক্সটেনশনের প্রোগ্রাম ফাইলে নিজেকে যুক্ত করে। ওই প্রোগ্রাম চালালেই ভাইরাস ছড়ায়।
৩. ম্যাক্রো ভাইরাস (Macro Virus)
মাইক্রোসফট ওয়ার্ড ও এক্সেলের মতো ডকুমেন্টের ম্যাক্রোতে লুকিয়ে থাকে। ইমেইলে আসা ডকুমেন্টের মাধ্যমে বেশি ছড়ায়।
৪. রেসিডেন্ট ভাইরাস (Resident Virus)
কম্পিউটারের র্যাম বা মেমোরিতে স্থায়ীভাবে বসে থাকে। মূল ফাইল মুছে ফেললেও এটি সক্রিয় থাকতে পারে।
৫. ডাইরেক্ট অ্যাকশন ভাইরাস (Direct Action Virus)
নির্দিষ্ট ফাইল চালু করলে সক্রিয় হয়, কাজ শেষে চুপ হয়ে যায়। সাধারণত নির্দিষ্ট ফোল্ডারের ফাইলে আক্রমণ করে।
৬. পলিমরফিক ভাইরাস (Polymorphic Virus)
প্রতিবার ছড়ানোর সময় নিজের কোড বদলে ফেলে। ফলে অ্যান্টিভাইরাসের পক্ষে একে শনাক্ত করা কঠিন।
৭. ওভাররাইট ভাইরাস (Overwrite Virus)
ফাইলের মূল তথ্য মুছে নিজের কোড বসিয়ে দেয়। এতে আক্রান্ত ফাইল আর উদ্ধার করা যায় না।
৮. মাল্টিপারটাইট ভাইরাস (Multipartite Virus)
একসঙ্গে বুট সেক্টর ও প্রোগ্রাম ফাইল—দুই জায়গাতেই আক্রমণ করে। তাই এটি দ্রুত ছড়ায়।
৯. ব্রাউজার হাইজ্যাকার (Browser Hijacker)
ব্রাউজারের হোমপেজ ও সার্চ ইঞ্জিন বদলে দেয় এবং অপ্রয়োজনীয় বিজ্ঞাপনের সাইটে নিয়ে যায়।
১০. ওয়েব স্ক্রিপ্টিং ভাইরাস (Web Scripting Virus)
ওয়েবসাইটের কোডে লুকিয়ে থাকে। ওই সাইটে ভিজিট করলেই ব্যবহারকারীর ব্রাউজারে আক্রমণ চালায়।
ভাইরাস, ওয়ার্ম ও ট্রোজানের পার্থক্য
অনেকেই সব ক্ষতিকর প্রোগ্রামকে কম্পিউটার ভাইরাস বলেন। আসলে এগুলো সবই “ম্যালওয়্যার”-এর অংশ, তবে বৈশিষ্ট্যে পার্থক্য আছে।
| বিষয় | ভাইরাস | ওয়ার্ম | ট্রোজান |
|---|---|---|---|
| ছড়ানোর ধরন | অন্য ফাইলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে | নিজে নিজেই নেটওয়ার্কে | ভালো সফটওয়্যারের ছদ্মবেশে |
| ব্যবহারকারীর সাহায্য লাগে? | হ্যাঁ | না | হ্যাঁ |
| নিজের কপি তৈরি করে? | হ্যাঁ | হ্যাঁ | না |
| মূল উদ্দেশ্য | ফাইল নষ্ট করা | দ্রুত ছড়ানো ও নেটওয়ার্ক ধীর করা | তথ্য চুরি ও গোপন প্রবেশাধিকার |
এ ছাড়া র্যানসমওয়্যার নামের আরেক ধরনের ম্যালওয়্যার আছে, যা ফাইল লক করে মুক্তিপণ দাবি করে।
কম্পিউটার ভাইরাস আক্রমণের লক্ষণ
আপনার কম্পিউটার ভাইরাসে আক্রান্ত কি না, তা বোঝার কিছু সাধারণ লক্ষণ:
- কম্পিউটার হঠাৎ অস্বাভাবিক ধীর হয়ে যাওয়া।
- বারবার হ্যাং হওয়া বা নিজে নিজে রিস্টার্ট হওয়া।
- অপরিচিত পপ-আপ বিজ্ঞাপন দেখা দেওয়া।
- ফাইল বা ফোল্ডার হঠাৎ উধাও হয়ে যাওয়া।
- ফোল্ডার শর্টকাট হয়ে যাওয়া (পেনড্রাইভে খুব সাধারণ)।
- অজানা প্রোগ্রাম নিজে থেকে ইনস্টল হওয়া।
- ব্রাউজারের হোমপেজ বদলে যাওয়া।
- হার্ডডিস্কের জায়গা অকারণে কমে যাওয়া।
- অ্যান্টিভাইরাস নিজে থেকে বন্ধ হয়ে যাওয়া।
- আপনার ইমেইল বা সোশ্যাল মিডিয়া থেকে বন্ধুদের কাছে অদ্ভুত বার্তা যাওয়া।
এর মধ্যে কয়েকটি লক্ষণ একসঙ্গে দেখা দিলে দেরি না করে ব্যবস্থা নিন।

কম্পিউটার ভাইরাস প্রতিরোধের উপায়
কম্পিউটার ভাইরাস থেকে বাঁচার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সচেতনতা। নিচের ১০টি অভ্যাস মেনে চলুন:
১. বিশ্বস্ত অ্যান্টিভাইরাস ব্যবহার করুন
Windows Defender, Kaspersky, Bitdefender বা Avast-এর মতো ভালো অ্যান্টিভাইরাস ইনস্টল করে নিয়মিত আপডেট রাখুন। মাইক্রোসফটের নিরাপত্তা সমাধান সম্পর্কে জানতে দেখুন Microsoft Security।
২. অপারেটিং সিস্টেম আপডেট রাখুন
উইন্ডোজ ও অন্যান্য সফটওয়্যারের সিকিউরিটি আপডেট সময়মতো ইনস্টল করুন।
৩. পাইরেটেড সফটওয়্যার এড়িয়ে চলুন
ক্র্যাক সফটওয়্যারের সঙ্গে প্রায়ই ভাইরাস লুকিয়ে থাকে।
৪. পেনড্রাইভ স্ক্যান করে খুলুন
অন্যের পেনড্রাইভ লাগানোর পর আগে স্ক্যান করুন, তারপর খুলুন।
৫. অপরিচিত ইমেইল অ্যাটাচমেন্ট খুলবেন না
অচেনা প্রেরকের ফাইল বা লিংক থেকে দূরে থাকুন।
৬. শুধু অফিসিয়াল সাইট থেকে ডাউনলোড করুন
সফটওয়্যার সবসময় নির্মাতার অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে নিন।
৭. ফায়ারওয়াল চালু রাখুন
উইন্ডোজের বিল্ট-ইন ফায়ারওয়াল কখনো বন্ধ করবেন না।
৮. নিয়মিত ব্যাকআপ রাখুন
গুরুত্বপূর্ণ ফাইল এক্সটার্নাল হার্ডডিস্ক বা Google Drive-এ ব্যাকআপ রাখুন।
৯. শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ও টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন ব্যবহার করুন
অনলাইন অ্যাকাউন্ট সুরক্ষায় এটি খুব কার্যকর।
১০. সন্দেহজনক লিংকে ক্লিক করবেন না
আপনি পুরস্কার জিতেছেন” ধরনের লিংক প্রায়ই ফাঁদ। সাইবার নিরাপত্তার আরও টিপস পাবেন CISA-এর Secure Our World পেজে।
আরও পড়ুন: ইন্টারনেটে নিরাপদ থাকার উপায় | হ্যাক হওয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্ট উদ্ধারের উপায়
ভাইরাসে আক্রান্ত হলে কী করবেন?
- প্রথমেই ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করুন।
- অ্যান্টিভাইরাস দিয়ে “Full Scan” চালান।
- সন্দেহজনক প্রোগ্রাম কন্ট্রোল প্যানেল থেকে আনইনস্টল করুন।
- ব্রাউজারের এক্সটেনশন চেক করে অপরিচিতগুলো মুছে দিন।
- প্রয়োজনে “Safe Mode”-এ গিয়ে স্ক্যান করুন।
- সমস্যা না মিটলে ব্যাকআপ নিয়ে উইন্ডোজ নতুন করে ইনস্টল করুন।
- গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ড অন্য নিরাপদ ডিভাইস থেকে বদলে নিন।
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন: কম্পিউটার ভাইরাস কে আবিষ্কার করেন?
উত্তর: “কম্পিউটার ভাইরাস” শব্দটি জনপ্রিয় করেন ফ্রেড কোহেন (১৯৮৩)। আর পিসির প্রথম ভাইরাস “Brain” তৈরি করেন বাসিত ও আমজাদ ফারুক আলভি।
প্রশ্ন: মোবাইলে কি কম্পিউটার ভাইরাস আক্রমণ করে?
উত্তর: কম্পিউটারের ভাইরাস সরাসরি মোবাইলে কাজ করে না, তবে মোবাইলের জন্য আলাদা ম্যালওয়্যার আছে।
প্রশ্ন: ফ্রি অ্যান্টিভাইরাস কি যথেষ্ট?
উত্তর: সাধারণ ব্যবহারের জন্য Windows Defender যথেষ্ট ভালো, যদি সেটি নিয়মিত আপডেট থাকে।
প্রশ্ন: ভাইরাস কি হার্ডওয়্যার নষ্ট করতে পারে?
উত্তর: সাধারণত ভাইরাস সফটওয়্যার ও ডেটার ক্ষতি করে; হার্ডওয়্যার সরাসরি নষ্ট হওয়ার ঘটনা খুবই বিরল।
শেষ কথা
কম্পিউটার ভাইরাস একটি নীরব কিন্তু ভয়ংকর হুমকি। একটু অসাবধানতায় বছরের পর বছরের জমানো তথ্য হারিয়ে যেতে পারে। তবে ভালো অ্যান্টিভাইরাস, নিয়মিত আপডেট, নিরাপদ ডাউনলোড ও সচেতন ব্রাউজিং—এই কয়েকটি অভ্যাসই আপনাকে কম্পিউটার ভাইরাস থেকে সুরক্ষিত রাখতে যথেষ্ট।