নীড়ের সঙ্গী (০১): অভিমানের রাত ও রোজার নীরব কান্না

রাতের খাবারের টেবিলে অস্বস্তিকর মুহূর্ত

রাতের খাবার খেতে বসেছিল রোজা। ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা হওয়ায় এই সময়টায় ক্ষুধাটা একটু বেশিই অনুভব করে সে। সারাদিনের কাজ শেষে অনেকটা কষ্ট করে নিজের খাবারটা নিয়ে বসেছিল।

প্লেটে ছিল অল্প ভাত আর আলু ভর্তা।

মাত্র দু-এক লোকমা ভাত মুখে তুলেছে, এমন সময় হঠাৎ ফারহান এসে তার সামনে দাঁড়িয়ে গেল।

কোনো কথা না বলে ফারহান রোজার সামনে থাকা প্লেটটি সরিয়ে নিল। এরপর পাশে থাকা পানিভর্তি জগটি হাতে নিয়ে প্লেটের ভাতের ওপর পানি ঢেলে দিল।

রোজা বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল।

কিছুক্ষণ যেন বুঝতেই পারল না কী ঘটল।

ফারহান প্লেটটি একপাশে রেখে শান্ত অথচ কঠিন স্বরে বলল,

— “রুমে যাও।”

রোজা অবাক চোখে তাকিয়ে রইল।

তারপর ধীরে ধীরে বলল,

— “কিন্তু আমি তো খাচ্ছিলাম। এখন কী খাব?”

ফারহানের মুখে কোনো পরিবর্তন হলো না।

— “রুমে যাও বলেছি।”

রোজা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর আবার প্রশ্ন করল,

— “খাব না?”

— “না। রুমে যাও।”

কথাগুলো শুনে রোজার বুকটা ভার হয়ে গেল।

সে আর কিছু বলল না। চুপচাপ হাত ধুয়ে একটু পানি পান করল। এরপর চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।

ক্ষুধায় তখন তার পেট যেন মোচড় দিচ্ছে।

সারাদিনের ব্যস্ততার পর রাতের খাবারের অপেক্ষায় ছিল সে। কিন্তু খাবার মুখে তোলার পরপরই এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে, সেটা স্বপ্নেও ভাবেনি।

রোজার জমে থাকা অভিমান

রোজা প্লেটটি রান্নাঘরে নিয়ে যাওয়ার জন্য হাত বাড়াল।

ফারহান সঙ্গে সঙ্গে বলল,

— “প্লেট ধরবে না।”

রোজার চোখে পানি চলে এলো।

সে অবাক হয়ে ফারহানের দিকে তাকাল।

কী এমন হয়েছে যে মানুষটা হঠাৎ এমন আচরণ করছে?

কাঁপা গলায় বলল,

— “রান্নাঘরে রেখে আসব।”

ফারহান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

— “কোথাও রাখতে হবে না। সবাই সকালে ঘুম থেকে ওঠার আগ পর্যন্ত প্লেটটা এখানেই থাকবে।”

রোজা আর কোনো উত্তর দিল না।

ফারহান আবার বলল,

— “তুমি রুমে গিয়ে শুয়ে থাকো। আমি কিছুক্ষণ পর আসছি।”

রোজা ধীরে ধীরে রুমের দিকে হাঁটতে শুরু করল।

দু-এক পা এগিয়ে যাওয়ার পর ফারহানের কণ্ঠ আবার শুনতে পেল।

— “শুকনো ভাত আছে আরও?”

রোজা চুপচাপ মাথা নাড়ল।

তারপর ফারহান বলল,

— “ঠিক আছে। তুমি যাও।”

রোজা চলে গেল।

একা ঘরে রোজা

রুমে ঢুকেই বিছানায় বসে পড়ল রোজা।

তার চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল।

সেদিন দুপুরে অল্প কিছু ভাত খেয়েছিল সে। এরপর আর কিছু খাওয়া হয়নি। বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত নিজের হাতে রান্নাবান্না করেছে।

রাতে খাবার টেবিলে এসে দেখেছিল তার জন্য মাংস রাখা হয়নি।

মাছ ছিল, কিন্তু এই সময়টায় মাছের গন্ধ তার কাছে সহ্য হয় না। মাংসই কোনোভাবে খেতে পারে সে।

মাংস না পেয়ে শেষ পর্যন্ত দুপুরের আলু ভর্তাটুকু ফ্রিজ থেকে বের করে খেতে বসেছিল।

কিন্তু সেই খাবারটুকুও শেষ করতে পারল না।

রোজা বিছানায় শুয়ে চোখ বন্ধ করল।

মনে হলো, এই বাড়িতে তার কথা শোনার মতো কেউ নেই।

ফারহানের সঙ্গে রোজার সম্পর্ক

ফারহানের সঙ্গে রোজার বিয়ে হয়েছে প্রায় দেড় বছর।

ফারহান রোজার চেয়ে বয়সে প্রায় এগারো বছরের বড়। স্বভাবেও সে বেশ গম্ভীর।

সহজে হাসে না, খুব বেশি কথা বলে না। প্রয়োজন ছাড়া কথাবার্তা বলতে পছন্দ করে না।

একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ভালো পদে চাকরি করে ফারহান। পরিবারের প্রতি তার দায়িত্ববোধও প্রবল।

ফারহান তিন ভাই-বোনের মধ্যে সবার বড়।

মাকে সে খুব ভালোবাসে।

বিয়ের শুরুতেই রোজাকে ফারহান বলেছিল, তার মায়ের যেন কোনো কষ্ট না হয়।

মা যা বলবেন, যতটা সম্ভব তা মেনে চলতে হবে—এটাই ছিল ফারহানের প্রত্যাশা।

এমনকি পরিবারের কারও বিরুদ্ধে তার কাছে অভিযোগ না করার কথাও বলেছিল সে।

রোজা তখন সব কথা নীরবে শুনেছিল।

বিয়ের পর থেকে নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে ফারহানের পরিবারের সঙ্গে মানিয়ে চলার।

সংসারে নীরব হয়ে যাওয়া রোজা

শুধু ফারহান নয়, রোজার নিজের পরিবারের লোকজনও বিয়ের সময় তাকে অনেক কথা বুঝিয়ে দিয়েছিল।

তারা বলেছিল, শ্বশুরবাড়ির মানুষের সঙ্গে মানিয়ে চলতে।

কারও সঙ্গে তর্ক না করতে।

কেউ কিছু বললে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর না দিতে।

রোজা চেষ্টা করেছিল সেভাবেই চলতে।

কিন্তু সবকিছু মেনে চলতে চলতে একটা সময় নিজের কথাগুলোই যেন হারিয়ে ফেলেছে সে।

কারও সঙ্গে মন খুলে কথা বলতে পারে না।

কষ্ট হলে কাউকে বলতে পারে না।

হাসতে ইচ্ছে করলেও অনেক সময় হাসে না।

ফারহানও খুব বেশি কথা বলে না।

তার গম্ভীর মুখের দিকে তাকিয়ে রোজার অনেক কথাই আর বলা হয়ে ওঠে না।

কখনো কখনো ফারহানকে দেখলে রোজার মনে হয়, মানুষটার কাছে নিজের মনের কথা বলার অধিকারটুকুও যেন সে হারিয়ে ফেলেছে।

অথচ সংসারে নিজের একজন আপন মানুষকে তো নিজের কষ্টের কথাগুলো বলা যায়।

এই ভাবনাটা মনে এলেই বুকের ভেতরটা আরও ভারী হয়ে যায় রোজার।

পরদিন সকালের ঘটনা

পরদিন সকাল।

সাতটার দিকে ফারহানের মা জহুরা বেগম ঘুম থেকে উঠলেন।

প্রতিদিনের মতো তিনি ফ্রেশ হয়ে নিজের কাজকর্ম শেষ করতে করতে সাড়ে সাতটা বেজে গেল।

রুম থেকে বের হয়ে ড্রয়িংরুমে আসতেই তিনি কিছুটা থমকে গেলেন।

ঘরের প্রধান বাতি এখনো জ্বলছে না।

রান্নাঘর থেকেও কোনো শব্দ আসছে না।

জহুরা বেগম রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেলেন।

লাইট জ্বালিয়ে দেখলেন, আগের রাতের কিছু এঁটো থালা-বাসন সিঙ্কে পড়ে আছে।

রান্নার কোনো প্রস্তুতিও শুরু হয়নি।

তিনি ভ্রু কুঁচকে তাকালেন।

রোজা এখনো ঘুম থেকে ওঠেনি?

মুহূর্তেই তার মেজাজ খারাপ হয়ে গেল।

দ্রুত পায়ে ছেলের ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন।

দরজা ভেতর থেকে বন্ধ।

জহুরা বেগম দরজায় জোরে কয়েকবার ধাক্কা দিলেন।

তারপর গম্ভীর কণ্ঠে ডাকলেন,

— “রোজা!”

ভেতর থেকে কোনো উত্তর এলো না।

তিনি আবার দরজায় ধাক্কা দিয়ে ডাকলেন,

— “রোজা, দরজা খোলো!”

ঘরের ভেতরে তখনও নীরবতা।

রোজা কি ঘুমিয়ে আছে?

নাকি রাতের ঘটনার পর তার মন আরও খারাপ হয়ে গেছে?

জহুরা বেগমের কণ্ঠ আরও কঠিন হয়ে উঠল।

আর ঠিক তখনই ঘরের ভেতর থেকে নড়াচড়ার শব্দ শোনা গেল।

এরপর কী ঘটল?

চলবে…

নীড়ের সঙ্গী (০১) এখানেই শেষ। পরবর্তী পর্বে রোজা ও ফারহানের সংসারে নতুন কী পরিস্থিতি তৈরি হয়, তা জানতে সঙ্গে থাকুন।

Leave a Comment